বইয়ের ফেরিওয়ালা আসাদ ও তার পাঠাগার


লিখেছেন:
পাবলিশ হয়েছে: সেপ্টে ২৯, ২০২০

নাম তার আতিফ আসাদ। জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলার ডোয়াইল ইউনিয়নের হাসড়া মাজালিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামে বাস তার। মা-বাবা আর সাত ভাই-বোনের দুঃখ-কষ্টের সংসারে বেড়ে ওঠা আসাদের। পরিবারের সবার ছোট আসাদ। পড়াশোনা করছেন জামালপুর সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগে অনার্স প্রথম বর্ষে। পরিবারের অভাব-অনটনের কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে থাকাবস্থায় শুরু করেন ধানকাটা, দিনমজুরি, রং বার্নিশ, রাজমিস্ত্রি, রডমিস্ত্রিসহ বিভিন্ন কাজ। এমনকি মায়ের সঙ্গে নকশিকাঁথায়ও সুই ফুটিয়েছেন আসাদ। এসব করেছেন কেবলই খেয়ে-পরে বেঁচে থাকা এবং পড়ালেখার খরচ জোগানোর জন্য। তবু বারবার হোঁচট খেয়েছেন। অভাবের কারণে স্কুলে যেতে পারেননি নিয়মিত। তবু তিনি সমাজে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে গড়ে তোলেন পাঠাগার। ২০১৮ সালে প্রতিবেশী এক আপুর দেওয়া ২০টি বই নিয়ে যাত্রা শুরু করে তার ‘মিলন স্মৃতি পাঠাগার’।

ঘর ভাড়া নিয়ে পাঠাগার শুরুর টাকা ছিল না তার। তবে তার ইচ্ছেশক্তির কাছে ঠুনকো হয়ে যায় অবকাঠামোর বাধা। নিজের ঘরের বারান্দায় পাটকাঠির বেড়া দিয়ে পাঠাগার শুরু করেন আসাদ। বই সংরক্ষণে বাবার পরামর্শে ঘরে থাকা কাঠ দিয়ে তৈরি করেন একটা নড়বড়ে বুকশেলফ। শুরুর দিকে মানুষের কাছ থেকে চেয়ে দু’একটা করে বই নিয়ে বইয়ের সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করেন আসাদ। পাঠকের হাতে তুলে দেন নতুন বই। এরপর গ্যাসটন ব্যাটারিজ লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক কেএইচ মালেক পাঠাগারের এই ভালো কাজ দেখে খুশি হয়ে ১০০টি বই উপহার দেন এবং ভিয়েতনামে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সামিনা নাজ বই কেনার জন্য কিছু টাকা দেন। এতে তার পাঠাগার সমৃদ্ধ হতে থাকে।

পাঠাগার সম্পর্কে আসাদ বলেন, ‘ছাত্র, শিক্ষক, লেখক, চাকরিজীবী ও প্রবাসীদের দেওয়া বই নিয়ে আমার পাঠাগারে বর্তমানে প্রায় দুই হাজার বই আছে। আমি লেখাপড়ার পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি গিয়ে বই দিয়ে আসি সপ্তাহে দু’তিন দিন। এ ছাড়া কেউ কেউ ১০-১৫ কিলোমিটার দূর থেকেও ফোন দেন। সাইকেল চালিয়ে তাদেরও বই দিয়ে আসি। বর্তমানে প্রায় ১০০ পাঠক আছে আমার পাঠাগারের।’ আসাদ আরও বলেন, ‘শুরুর দিকে রাজ্যের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলাম। অনেকে উপহাস করতেন। এখনও করেন। তাতে আগে কষ্ট লাগলেও এখন গা শয়ে গেছে। অবসর সময়টুকু মানুষের জন্যই কাজে লাগাচ্ছি এবং তা বই দিয়ে আলোকিত করার মাধ্যমে।’

আসাদের পাঠাগারের জন্য এখন দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বই আসে। কুরিয়ারে বই আসে উপজেলায়। ১০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে সেসব বই নিয়ে আসেন আসাদ। আবার কোনো কারণে আসাদ বাড়ি না থাকলে, তার মা পাঠকের হাতে বই তুলে দেন এবং বই সংগ্রহ করেন। আসাদের ইচ্ছে ছিল নিজ উপজেলা সরিষাবাড়ীতে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হবে বইমেলা। প্রচণ্ড মনোবলের কারণে তার কাছের এক বড় ভাইয়ের সহায়তায় ২০২০ সালের ১৭, ১৮, ১৯ জানুয়ারি তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় বইমেলা। দেশের অনেক গুণী মানুষ তার বইমেলায় অতিথি হিসেবে আসেন। এতে তার ইচ্ছেশক্তি এবং আত্মবিশ্বাস বেড়েছে অনেক গুণ। তার বিশ্বাস, এই বইমেলা প্রতি বছর হবে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে স্বপ্নবাজ এই তরুণ বলেন, ‘বই পড়ার আন্দোলন আমার গ্রাম থেকে অন্য গ্রাম হয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ূক। প্রতিটি গ্রামে একটি করে পাঠাগার গড়ে উঠুক। লাখো পাঠাগারে দেশ একাকার হয়ে যাক। সবাই বই পড়ুক, এর চেয়ে বড় স্বপ্ন এবং বড় চাওয়া কিইবা হতে পারে আমার!’


মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল কেউ দেখতে পারবে না!

আরো পড়তে পারেন