মোজাম্মেল হকঃ একজন কিংবদন্তীর গল্প


লিখেছেন:
পাবলিশ হয়েছে: অক্টো ১২, ২০২০

কিছু মানুষ তো থাকে, যারা প্রতিনিয়ত স্বপ্ন দেখে। হাজারো তরুণের স্বপ্নকে গুরুত্ব দেয়। তাদেরকে আলোর পথে নিয়ে যায়। তাদের স্বপ্নকে সত্যি করে তুলে।মোজাম্মেল হক স্যার তেমনই একজন মানুষ। যিনি আলোর মশাল হাতে আলোকিত করেছেন দক্ষিণ মাদারগঞ্জকে। প্রত্যন্ত এক জনপদে পৌছে দিয়েছেন শিক্ষার আলো। আজন্ম যিনি মানুষের পাশে থেকেছেন। হাজারো দরিদ্রবাবার মেধাবী ছেলের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। ক্ষণজন্মা, কীর্তিমান মহান শিক্ষক মোজাম্মেল হক স্যারের ৪র্থ প্রয়াণ দিবসে আমরা শোকাহত।
সময়টা ১৯৭৩।যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি বাংলাদেশ। ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য দরকার হাজারো কর্মবাজ,মেধাবী মানুষের।হয়তোবা সময়ের প্রয়োজনেই প্রত্যন্ত এক জনপদ চর ভাটিয়ানীতে জন্ম হল এক শিশুর। বাবা মা নাম রাখলেন মোজাম্মেল হক।
বাবা আজগর আলী মন্ডল এবং মা সালেহা বেগমের ৭ সন্তানের মধ্যে মোজাম্মেল হক ছিলেন ৩য়।
দরিদ্র পরিবারের সন্তান মোজাম্মেল হকের স্কুলে ভর্তি হওয়াটা ছিল সব থেকে বড় বিষ্ময়ের!কিন্তু নিজের ভেতর পুষে রাখা স্বপ্নের কাছে তিনি কখনোই হার মানেন নি। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়েই ভর্তি হন প্রথমে ভাটিয়ানী মাদ্রাসায় পরে মুজাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ভর্তি রোল ছিল-১৩। এরপর প্রতিটা ক্লাসেই তিনি ফার্স্ট হয়েছেন।
১৯৮৩ সালে ৫ম শ্রেণির প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার কোচিং চলাকালে গণিত, বাংলা, সমাজ ও বিজ্ঞান বিষয়ের উপর প্রস্তুতিমূলক একটি টেস্ট পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।সেখানে মোজাম্মেল হকের খাতায় তৎকালীন প্রধান শিক্ষক মরহুম আবুল হোসেন কোন ভুল খুঁজে পান নি এবং তখন তিনি মাথায় হাত বুলিয়ে তাকে আশীর্বাদ করে বলেন,”তুই একদিন অনেক ভালো করবি।”
সত্যিই তিনি ভালো করেছিলেন। সেবার অনুষ্ঠিত প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় তিনি মাদারগঞ্জ উপজেলায় ফার্স্ট হয়ে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ করেন। যেটি ছিল মাদারগঞ্জ উপজেলার জন্যও অত্যন্ত গৌরবের। এই বৃত্তিপাওয়াকে কেন্দ্র করে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।
এরপর ১৯৮৪ সালে ভর্তি হন শ্যামগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে।এখান থেকে ১৯৮৬ সালে জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় আবারও মাদারগঞ্জে প্রথম স্থান অর্জন করে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পান। এটি ছিল শ্যামগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রথম কোন ছাত্রের ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি অর্জন।অতঃপর ১৯৮৯ সালে তিনি প্রথম বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। সেবার এসএসসি পরীক্ষায় অনেক শিক্ষার্থীই নকলের আশ্রয় নেয়। কিন্তু মোজাম্মেল হক অত্যন্ত সৎভাবে পরীক্ষা দেন এবং এটি দেখে তৎকালীন হল সুপার ও শিক্ষকগণ তার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
শুধু পড়াশোনা নয়,যুক্ত ছিলেন স্কুলের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমেও। তিনি চমৎকার অভিনয় করে সবাইকে মুহূর্তেই তাক লাগিয়ে দিতে পারতেন।
এরপর ১৯৯১ সালে আনন্দমোহন কলেজ থেকে ৭০০ নম্বর পেয়ে প্রথম বিভাগে উর্তীর্ণ হন।
দরিদ্রবাবার স্বপ্নকে পূরণ করতে গিয়ে তাকে অনেক বাধাই পোহাতে হয়েছে। আর্থিক সংকট যেন ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী।কিন্তু তাঁর মেধা, পরিশ্রম আর স্বপ্নের কাছে এসব বাধা কখনোই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে নি। তিনি এগিয়ে গিয়েছেন সাফল্যের সাথে।
এবার তাঁর ঢাকা যাত্রা। অনেক স্বপ্ন দেখতেন মেডিকেলে পড়ে ডাক্তার হবেন।কিন্তু ভাইভাতে গিয়ে তদবিরের কাছে তাকে হার মানতে হয়!
তবুও তিনি দমে যান নি। এক বুক হতাশা নিয়ে ময়মনসিংহ শহরে আবার চলে আসলেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে “এগ্রিকালচার” বিষয়ে ভর্তি হন।
আনন্দমোহনে পড়া অবস্থায় তৎকালীন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে যুক্ত হয়েছিলেন রাজনীতিতেও। দেশের গণতন্ত্র ও সুশাসনের জন্য তখন অসীম সাহসে লড়েছেন তরুণ মোজাম্মেল। এ লড়াই করতে গিয়ে তাকে বিভিন্নভাবে নির্যাতনেরও শিকার হতে হয়েছে।
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় যুক্ত হন ময়মনসিংহের “দি ক্যাডেট কোচিং সেন্টারে”। তিনি শ্যামগঞ্জ থেকে দূরে থাকলেও সবসময় নিজের এলাকার কথা ভাবতেন। তিনি যে কষ্ট করে পড়াশোনা করেছেন, সেটা যেন দরিদ্র শিক্ষার্থীদের করতে না হয়, এটা থেকেই তার ভাবনায় কোচিংএর কথা চলে আসে। তাঁর মতো মেধাবীর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রয়াস থেকেই ১৯৯৯ সালে অজপাড়াগাঁয়ে তিনি ঘরে ঘরে শিক্ষার কথা বলে বেড়ান। কৃষক বাবার ঘরে গিয়ে তাঁর ছেলেমেয়েকে স্কুলে ভর্তি করান। এবার বন্ধুদের নিয়ে শুরু করেন,” কালিবাড়ী প্রি ক্যাডেট স্কুলে”র যাত্রা।
ক্যাডেট কোচিংএ ক্লাস নেওয়ার সময় তিনি বার বার ভাবতেন,নিজের এলাকায় ক্যাডেট কোচিং চালু করা যায় কি না!সে স্বপ্ন থেকেই ২০০৩ সালে মাত্র একজন ছাত্র নিয়ে যাত্রা শুরু করে “দি ইউনিক এডুকেশন একাডেমী”। তিনি যে সময় এ অঞ্চলে ক্যাডেটের কথা বলেন, তখন এ অঞ্চলের তেমন কেউই ক্যাডেট শব্দের সাথেই পরিচিত ছিল না।
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৬ সালে বিএসসি শেষ করার পর ” এগ্রোনমি” বিভাগে ২য় শ্রেণিতে এম.এস.সি শেষ করেন। অর্থের কাছেও সত্যিই কিছু সময় হার মানতে হয়! “ALLELOPATHIC EFFECTS OF FIVE SELECTED WEEDS ON RICE (BRRI Dhan-28)” বিষয়ের উপর এক দারুণ গবেষণা করেন এবং পিএইচডি করার জন্য সুযোগ পেয়ে যান অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার। কিন্তু এক থেকে দেড় লক্ষ টাকার কাছে সত্যিই সেদিন তাকে হার মানতে হয়েছিল।
এত স্বপ্নভঙ্গের মাঝে আবার নতুন করে শুরু করলেন ক্যাডার সার্ভিসে যাওয়ার। টানা দুইবার ভাইভাতে গিয়ে আবারও তাকে হার মানতে হয়। কিন্তু দমে তিনি যান নি!
শিক্ষাজীবনেই তাকে দায়িত্ব নিতে হয় পরিবারের। ছোট ভাইবোনদের পড়াশোনা, পরিবারের খরচ অপরদিকে স্বপ্নের কাছে বার বার পরাজিত হওয়ার হতাশার মধ্যেই আলো হয়ে দেখা দেয় প্রাথমিক শিক্ষার জন্য উপবৃত্তি প্রকল্পের জেলা পরিদর্শন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ। ২০০৩ সালে তিনি কক্সবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে যোগদান করেন।তখন তিনি কক্সবাজার থেকেই ক্যাডেটে অধ্যয়নরত সোহাগ নামে একজন শিক্ষার্থীকে মোবাইলে পাঠদান করাতেন। যিনি মোজাম্মেল হকের হাত ধরে শ্যামগঞ্জ থেকে প্রথম ক্যাডেট কলেজে চান্স পান।
২০১৬ সাল পর্যন্ত দি ইউনিক এডুকেশন একাডেমী থেকে স্যারের হাত ধরে ১৬ জন লিখিত এবং ৬ জন শিক্ষার্থী চূড়ান্ত পরীক্ষায় উর্তীর্ণ হয়।
সামাজিক বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডেও তিনি সবসময় অংশগ্রহণ করতেন। অন্যের সমস্যাগুলোকে তিনি খুব সহজেই উপলব্দি করতে পারতেন। শ্যামগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষাদানকে আরও গতিশীল করতে তিনি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির দায়িত্ব পালন করেছেন। কর্মজীবনে তিনি কখনোই অফিসের বড় কর্মকর্তা হিসেবে ছিলেন না। প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী হিসেবে তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সবার সাথেই হাস্যোজ্জল ও বিনয়ের সাথে কথা বলতেন। হয়তোবা এজন্যই তাকে ছাত্র, শিক্ষক,বন্ধু,  শুভানুধ্যায়ীদের এতটা কাছে নিয়ে গেছে।
২০০১ সালের ১৪ই অক্টোবর শ্যামগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা জহুরা বেগম হাসির সাথে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।রেখে গেছেন দুই মেয়ে মেহজাবীন হক মৃত্তিকা এবং মার্ধিয়া হক মাধুর্যসহ অসংখ্য শিক্ষার্থী, ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীকে।

২০১৬ সালের ১৪ই অক্টোবর। সেদিন তাঁর বিবাহবার্ষিকী ছিল। সবসময় তিনি হাস্যোজ্জল ছিলেন এবং সবার সাথেই মজা করতেন। সেদিনও তিনি পরিবারের সাথে তাই করছিলেন। কিন্তু কে জানত, সে রাতই হবে তাঁর জীবনের শেষ রাত!বিষাদের নিস্তব্ধ সেই রাতে হঠাৎ ই তিনি বুকে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করেন। সাথে সাথে স্থানীয় ডাক্তাররা চলে আসেন। অবস্থাসংকটাপন্ন হওয়ায় তাড়াতাড়ি জামালপুরের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে তিনি মহান আল্লাহর ডাকে চলে গেছেন। পরিবার, আত্মীয়, অসংখ্য শিক্ষার্থী, বন্ধু, শুভানুধ্যায়ীদের চাপা আর্তনাদে সেদিন পুরো শ্যামগঞ্জে নেমে আসে শোকের ছায়া। জানাজায় হাজারো মানুষের ঢল। কেউ কেউ ভেঙ্গে পড়েন কান্নায়। শোকের মাতম নিয়ে তাকে চিরদিনের মত সমাহিত করা হয় নিজ বাড়ীতে।
শ্যামগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহবুবুল বাসিদ রন্জু স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন,”মোজাম্মেল ছিল এমন একজন ব্যক্তি, যিনি মুহূর্তেই সবকিছু ম্যানেজ করতে পারতেন। একটা ডুবন্ত জাহাজকে কপিকল মেশিনের সাহায্যে যেভাবে উপরে টেনে তোলা হয়। মোজাম্মেল তেমনই একটা ডুবন্ত মেধাকে জাগিয়ে দিতে পারতেন।”
মোজাম্মেল হক স্যার আজ আর আমাদের মাঝে নেই। অনন্তকালের পথে যাত্রা করেছেন। মহান আল্লাহ তা”আলা হয়তো ভালো মানুষদের খুব অল্প সময়ের জন্য দুনিয়াতে পাঠান।
সমাজকে জাগাতে, শিক্ষার আলো এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌছে দিতে তাঁর যে অবদান ছিল। সেটার জন্য তিনি আমাদের মাঝে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।আজকে আমরা এখানে যেসব শিক্ষার্থী দাঁড়িয়ে আছি,তাদেরকে নিজের মতো করে স্যার তৈরী করে গেছেন। আমরা সবসময় স্যারের স্মৃতিকে স্মরণ করি। এখনও শ্যামগঞ্জে আসলে মনে হয় আমাদের চোখের সামনেই মেজাম্মেল স্যার। ”তিনি লিটন স্যারের দোকানে আড্ডা দিচ্ছেন, ইউনিকের ভেতরে হাটছেন,ক্যাডেটদের ইংরেজি পড়াচ্ছেন।” আমরা কখনোই স্যারকে ভুলতে পারি না।মনে হয়, তিনি আমাদের মাঝে থেকেই সব কিছু করছেন।
হে মহান শিক্ষাগুরু,স্বপ্ন বিনির্মাণের কারিগর,তুমি সবসময় আমাদের মাঝে আছো।তুমি রবে নীরবে,হৃদয়ে মম……..

সম্পাদনা- শামীম মাহমুদ
তথ্যসূত্র- মোহাম্মদ জুলফিকার আলী,কে এম আশরাফ হোসেন লিটন,জহুরা বেগম হাসি,মাহবুবুল বাসিদ রন্জু


মন্তব্য লিখুন

আপনার ই-মেইল কেউ দেখতে পারবে না!

আরো পড়তে পারেন